ক্যারিয়ার কর্ণারসম্পাদকীয়

পিতার পথেই হাঁটছেন হারুনপুত্রী শামীমা হারুন লুবনা -নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

শামীমা হারুন লুবনা-এই সময়ের সাহসী নেত্রী, যিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগকে তারুণ্যের শক্তিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে উজ্জীবিত করে তুলেছেন। তাঁর নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াও তিনি ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মধন্য রাউজানের একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন।

তাঁর পিতা আবদুল্লাহ আল হারুন ভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিপুরুষ; তিনি অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সভাপতি ও সভাপতি ছিলেন। জনাব আবদুল্লাহ আল হারুন সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে রাউজানে মুসলিম লীগের কবর রচনা করে আওয়ামী লীগের বিজয় সুনিশ্চিত করেছিলেন। তিনি সে নির্বাচনে এমপিএ নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ আল হারুন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, বিশ্বস্ত ও স্নেহভাজন সহকর্মী ছিলেন। পঁচাত্তরে বাকশাল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা বাকশালের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন।

সেই পঁচাত্তরেই ঘটে গেল বঙ্গবন্ধু’র মর্মান্তিক শাহাদাত। তারপর তাঁর দলের নাম নিশানা মুছে ফেলার জন্য কত ষড়যন্ত্র হয়। নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক ধড়-পাকড়, হত্যা-নির্যাতন, হুলিয়া-মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগ ধ্বংসের সমস্ত আয়োজন চূড়ান্ত করে ফেলা হয়। এক বিভীষিকাময় দুঃসময়, চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় আওয়ামী লীগ। তাঁর দলের সেই ভয়ানক সময়ে যিনি চট্টগ্রামে দলের হাল ধরতে পারতেন সেই দক্ষ সংগঠক, সাহসী, অভিজ্ঞ ও পোড় খাওয়া নেতা আবদুল্লাহ আল হারুনের ওপর দ্বিমুখী চাপ প্রয়োগ করা হয়। একদিকে মন্ত্রিত্বের টোপ, অন্যদিকে তাঁর ঘরবাড়িতে তল্লাশি, হামলা করে ভেঙে চুরে তছনছ করে ফেলা হয়। মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তাঁকে ফেরারি জীবন যাপন করতে হয়। ঘরে থাকতে না পেরে তাঁর স্ত্রী ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে আত্মীয়-স্বজনের আজ এ বাসা, কাল ও বাসা ঘুরে ঘুরে যাবাবরের জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। এক সময় জনাব হারুন ধরা পড়লে পুলিশের সঙ্গে তাঁর লুকোচুরি অধ্যায়ের অবসান হয়।

বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলন, যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়, সেই ৬ দফা কর্মসূচি বঙ্গবন্ধু লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের বৈঠকে পেশ করার পর কোন দল তাকে সমর্থন দেয়া দূরে থাক, আলোচনা করতেও সম্মত হয়নি, সেজন্য ৬ দফার প্রতি সমর্থনের ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। যা’ না পেলে আইয়ুব বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে অঙ্কুরেই ৬ দফা আন্দোলন ধ্বংস করে ফেলতে চাইত। তখন আবদুল্লাহ আল হারুন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আজিজের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ৬ দফার সমর্থনে একটি বিবৃতি তৈরি করে তিনি ও এমএ আজিজসহ চট্টগ্রামের ৫ জন নেতার স্বাক্ষর নিয়ে তাদের নামে সেই বিবৃতি ইত্তেফাকে প্রকাশ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধেও আবদুল্লাহ আল হারুন অসাধারণ গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন। ৭১-এর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে আবদুল্লাহ আল হারুন চট্টগ্রামের শীর্ষ দুই নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী ও এম আর সিদ্দিকীকে নিয়ে ২৭ মার্চ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা চলে যান এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের মাধ্যমে দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা জানান এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য ও সমর্থন প্রদানের আহবান জানান।

লুবনা বঙ্গবন্ধুকে তাঁদের বাড়িতে আসতে দেখেছেন। ছোট্ট লুবনাকে বঙ্গবন্ধু সে সময় কোলে নিয়ে স্নেহাশীষ প্রদান করেন। সেই লুবনাই এখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিশ্বস্ত সৈনিক, আওয়ামী লীগের সংগ্রামী নেত্রী আর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। লোহাগাড়া তাঁর শ্বশুরবাড়ি, সেই সূত্রে তিনি দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক, রাউজানে তাঁর পৈত্রিক নিবাস; সেই সূত্রে তিনি উত্তরেরও নেত্রী। লুবনা যেন চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলার মেলবন্ধন। লুবনার বর সোহেল শাকুর খ্যাতনামা স্থপতি; তিনি চট্টগ্রাম স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারম্যান।

একাত্তরে পরাজিত ও পর্যুদস্ত ফ কা চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা স্বাধীনতার পর নতুন করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান ঘটাতে চাইলে আবদুল্লাহ আল হারুন তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাকে প্রতিরোধের সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। বস্তুত রাউজানে দু’টি বিপরীত আদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী দু’টি রাজনৈতিক পরিবারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটে। পরস্পরবিরোধী দুই আদর্শের একটি আবদুল্লাহ আল হারুনের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ, আরেকটি ফকা চৌধুরীর মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক আদর্শ। এই দুই পরিবারের মধ্য দিয়েই রাউজানের রাজনীতির প্রতীকায়ন ঘটেছে। আবদুল্লাহ আল হারুনের পিতামহ আবদুল লতিফ মাস্টার একটি শিক্ষাব্রতী প্রগতিশীল পরিবারের গোড়াপত্তন করেন। হারুনপুত্রী শামীমা হারুন লুবনা পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রেরণা এবং অগ্নিযুগের বীরকন্যা প্রীতিলতা-কল্পনা-বীণা দাশের কাছ থেকে পেয়েছেন আপসহীন সংগ্রামী চেতনা।

স্বাধীনতার পর গঠিত গণপরিষদের সদস্য হিসেবে জনাব হারুন সংবিধান প্রণয়নে যোগ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম স্বাক্ষরকারী। মুক্তিযুদ্ধে জনাব আবদুল্লাহ আল হারুন সমগ্র দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভারতে যান এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন ও সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জহুর আহমদ চৌধুরী ও এম আর সিদ্দিকী।

রাউজানের নোয়াপাড়ায় মাস্টারদা সূর্য সেনের বাস্তুভিটা জনৈক দুবাইওয়ালা দখল করে নিতে চাইলে জনাব আবদুল্লাহ আল হারুন তাতে বাধা প্রদান করেন এবং দুবাইওয়ালার আগ্রাসী থাবা থেকে মাস্টারদার বাস্তুভিটা রক্ষা করেন। তিনি সেখানে পরে মাস্টারদা সূর্য সেন কমপ্লেক্স তৈরি করেন। আবদুল্লাহ আল হারুন ছিলেন পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক। তিনি মাস্টারদার জীবিত সহকর্মীদের কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এনে লালদিঘি ময়দানে ধুমধাম করে মহাসমারোহে মাস্টারদার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁরই সুপুত্রী শামীমা হারুন চট্টগ্রামের একজন সংগ্রামী নেত্রী।
জনাব আবদুল্লাহ আল হারুন সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নিবেদিত ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পর দৈনিক ‘স্বাধীনতা’র প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন।

ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণের এই জ্যোতির্ময় পুরুষের কন্যা লুবনা পিতার এ সমস্ত গুণাবলীর অধিকারী হয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে।
শুধু পিতার রাজনীতি ও সংগ্রামের ঐতিহ্য-কে লুবনার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি ধরলে ভুল হবে। কারণ লুবনার নিজের যোগ্যতাও কম নয়।
লুবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত একজন মহীয়সী নারীনেত্রী। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

লুবনা পেশায় একজন ব্যবসায়ী। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ট্রেড বডিরও অন্যতম নেত্রী। তিনি উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়ী সংগঠনটির নেতৃত্ব প্রদান করেন। তিনি প্রণয়ন ইন্টেরিয়ার লিমিটেডের পরিচালক।
লুবনা চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নারীনেত্রী। তিনি ইনার হুইল অব চিটাগাং-এর প্রাক্তন সভাপতি।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের সংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। তিনি “আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান”-এর উপদেষ্টা এবং প্রত্যয় ’৭১-এর সাধারণ সম্পাদক।
তিনি ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের সদস্য সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে বিভিন্ন পদমর্যাদায় যুক্ত আছেন।

একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে লুবনা ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে সমর্পিত হন এবং সেই থেকে উত্তরোত্তর গভীর থেকে গভীরতর রাজনৈতিক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়তে পড়তে তিনি আজ চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সংগ্রামী নেত্রী। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নের সময় তিনি কলেজে ছাত্রলীগের অন্যতম নেত্রী ছিলেন। কলেজে ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক শাসন জারি হওয়ায় রাজনীতি নিষিদ্ধ ও নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সেখানে ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রমে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন।

চট্টগ্রাম বীর প্রসবিনী, বিপ্লবতীর্থ। এই বিপ্লবভূমি থেকে যেমন বিপ্লবের মহানায়ক মাস্টাদা সূর্য সেন, অনন্ত সিং, গনেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী-রা জন্ম নেন, তেমনি উদিত হন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত, বীণা দাশের মতো বিপ্লবী নারীরা। বিপ্লব কখনো থেমে থাকে না। এক বিপ্লবের রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই আরেক বিপ্লবের তরঙ্গ ওঠে। এমনিভাবে বিপ্লবের মাঝে বিপ্লব-এগিয়ে চলে বিপ্লব।

বীরকন্যা প্রীতিলতা ও অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্তের বিপ্লবের চারণভূমি চট্টগ্রাম সত্যিই সংগ্রামী নারী রাজনীতিকের আবির্ভাবের জন্য এক উর্বর জনপদ। যারা আকাশে জাগাতো ঝড়, সেই কিংবদন্তী বিপ্লবী নায়িকা প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, বীণা দাশ আজো চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে পূজিত হন। চট্টগ্রামের অন্তঃপুরবাসিনী নারী সমাজকে তাঁরা অলক্ষে থেকে নিয়ত সংগ্রামের উদার, উন্মুক্ত প্রান্তরে-যেখানে তাঁরা একদিন গুলি, বোমা, রক্ত, আগুনের হোলি খেলেছিলেন সেই খোলা আকাশের তলে নতুন রণক্ষেত্রে নতুন সংগ্রামের আহ্বানে অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে আসার ডাক দিয়ে যান।

সবাই শুনতে পায় না মাঠের বাঁশির ডাক, কেউ কেউ পান এবং তাঁরাই প্রীতিলতা-কল্পনা দত্তের বিপ্লবের ধারা এগিয়ে নিয়ে যান। এমনি করে একদিন বায়ান্নে মাঠের বাঁশির সুরে দীপক রাগে আগুন জ্বলে উঠলে জওশন আরা (লুবনার জেঠি আম্মা), প্রতিভা মুৎসদ্দী নতুন প্রীতিলতা-কল্পনা দত্ত হয়ে যান। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে খাস্তগীর স্কুলের সামনে ট্রাক মিছিল আসলে নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীরা টপাটপ ট্রাকে উঠে পড়ে স্লোগান ধরেন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। নারীর মিছিল এগিয়ে চলে; একদিন সাজেদা চৌধুরী মিছিলের পুরোভাগে এসে দাঁড়ান। তিনি আরেক অগ্নিকন্যা। সেই সাজেদা চৌধুরী আজ জাতীয় সংসদের মাননীয় উপনেতা। মিছিল আরো এগিয়ে চলে; অন্তহীন মিছিল যত সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতে থাকে তার আকার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। ষাটের দশকে মিছিলে দেখা দেয় নতুন মুখ-রাফিয়া আখতার ডলি, খালেদা খানম, রাশেদা খানম, জাহানারা আঙ্গুর-যাদের চোখে মুখে আগুনের হলকা, বিদ্যুতের ঝিলিক। অতঃপর একাত্তরের ২৫ মার্চ লালদিঘি ময়দানে জয় বাংলা বাহিনীর মার্চ পাস্টে সালাম নেন আরেক বিপ্লবী নেত্রী ডা. নুরুন্নাহার জহুর (লুবনার খালা)। মুক্তিযুদ্ধে কত নারী জীবন বিলিয়ে দেন, তার হিসেব লিখতে গেলে কলমের কালি ফুরিয়ে যাবে।

প্রীতিলতা-কল্পনা দত্তের বিপ্লবী রাজনীতির ধারা এগিয়ে নিতে অধুনা চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অনেক নারী মুখের আবির্ভাব ও অভিষেক ঘটেছে। তন্মধ্যে একজনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। প্রীতিলতা, কল্পনা দত্তের উত্তরাধিকার তাঁর মধ্যেই যেন বিশেষভাবে আরোপিত হয়েছে। তাঁর সংগ্রামী জীবন ও ব্যক্তিত্বের মধ্যেই যেন প্রীতিলতা-কল্পনা দত্তের রাজনীতি বাক্সময় হয়ে ওঠে। তিনি আবদুল্লাহ আল হারুনের কন্যা শামীমা হারুন লুবনা।

লুবনা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মহিলা আওয়ামী লীগের সাহসী নেত্রী। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের বিজয়ের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীককে জয়যুক্ত করার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন। শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে দেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। তাঁর সরকার নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ করেছে, রূপপুরে পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, মানুষের মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলার অতিক্রম করেছে, ঢাকায় মেট্রো রেল লাইন নির্মিত হচ্ছে, প্রত্যেক বড় বড় সড়ক চার, ছয়, আট লেইনে বিস্তৃত হয়েছে ও হচ্ছে। এইসব উন্নয়ন শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ভিশনারি নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে। বিশ্বে তিনি এখন ‘রাষ্ট্রনায়ক’-এর মর্যাদা পাচ্ছেন। তাঁকে বলা হচ্ছে ‘ডটার অব দি পিস’। লুবনা জননেত্রী শেখ হাসিনারই সার্থক অনুসারী।

নারী ন্যূন নয়, হীন নয়। ভারতীয় দর্শনে, সমাজে, রাষ্ট্রে নারীর জয়জয়কার। সুলতানা রাজিয়া, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ, দেবী চৌধুরানী, মাতঙ্গিনী হাজরার সাহস, তেজ, শৌর্যবীর্যের কাহিনী স্কুল পড়ুয়া শিশুরও গোচরীভূত। চট্টগ্রামে প্রীতিলতার উত্তরসাধক নারীরা কত বিপ্লব সংঘটিত করে কত ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তার ইয়ত্তা নেই। পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণকারী দলে একা প্রীতিলতাই ছিলেন নারী এবং তিনিই পুরুষ দলটিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। চোখের সামনে আছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, বঙ্গবন্ধুকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা, সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। এই দৃষ্টান্ত আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে নারীকে মান্য করে ও সমঝে চলতে হবে। নারী এমপি, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দানের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ উল্লেখযোগ্য আসনে নারীকে মনোনয়ন দেবে এতে কোনা সন্দেহ নেই।

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, লেখক।

এখানে মন্তব্য করুন