ক্যারিয়ার কর্ণারপাঁচমিশালী

কীর্তিমান পুরুষ অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইব্রাহীম : –নূসরাত জাহান কাদেরী

দক্ষিণ চট্টলা ডেক্স : আমরা স্কুলে পড়েছিলাম কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। মানব জীবন মরণশীল। কিন্তু মহৎ কার্যাবলীর দ্বারা আমাদের চারপাশে এমন অনেক জ্ঞানীগুণি প্রচার বিমুখ মানুষ রয়েছেন, যারা তাঁদের কর্মের মাধ্যমে দেশ, জাতি ও সমাজকে নানাভাবে আলোকিত করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন। এখনো করে যাচ্ছেন। আমি এখানে এমন এক কীর্তিমান পুরুষের আলোচনা করব, যিনি সারাটা জীবন জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন।

চট্টগ্রাম শহর থেকে শাহ্ আমান সেতু পেরিয়ে ২৫ কিলোমিটার গেলেই পটিয়া সদর। পটিয়া উপজেলার বুক চিরে গেছে চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহা সড়ক। পটিয়া সদরের পশ্চিমে শ্রীমতি খাল পূর্বে উত্তর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে গেছে চান্দখালী খাল। চান্দখালী খালের উপর সেতু। সেতুটি ইন্দ্রপুল নামেই বেশী খ্যাত। এটা একটি লবন শিল্প এলাকা। খালের উভয় পার্শ্বে গড়ে উঠেছে অনেক লবণ মিল। চান্দখালী খালের পূর্ব পার্শ্বে চট্টগ্রাম কক্সবাজার সড়কের উভয় পার্শ্বে অবস্থিত আল্লাই ও ওখারা নামের দুইটি গ্রাম, যাহা কাগজী পাড়া নামে প্রসিদ্ধ। বৃটিশ শাসনামলে এখানে কাগজ তৈরী হত বলে সেই প্রাচীনকাল থেকে এলাকাটি কাগজীপাড়া নামেই বেশী পরিচিতি লাভ করে।

এই গ্রামেই জন্ম গ্রহণ করেন কীর্তিমান পুরুষ অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইব্রাহীম। পিতা হযরত মৌলানা আশরাফ আলী আল কাদেরী (রাঃ), মাতা ফাতেমা বেগম। তাঁর পূর্ব পুরুষ সম্পর্কে জানা যায় তিনি সপ্তদশ শতকের আরাকান রাজসভার কবি আলাওলের আধ:স্থন বংশধর। অষ্টদশ শতকের মাঝামাঝি তাঁর পিতামহ মরহুম মোহাম্মদ আলী হাটহাজারী হতে হাসিমপুর, হাশিমপুর হতে পটিয়া উপজেলার আল্লাই গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তৎকালীন সময়ে আমাদের দেশে আরবী ফারসী ও উর্দুর চর্চা ছিল প্রচুর। তিনি বাল্যকালে এসব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা মক্তবে শেষ করেন। তিনি মাদ্রাসা হতে কুরআন, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে কলেজ হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। অতপর তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলিকাতা চলে যান এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে “দর্শন শাস্ত্রে” ১৯৩৩ সালে স্নাতকোত্তর (এম.এ) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যাওয়ার সুযোগ পান।

কিন্তু বিধিবাম তাঁর পিতার অসুস্থতার জন্য দেশে ফিরে এসে পিতার খেদমতে নিজকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি বাংলা, ইংরেজী, আরবী, উর্দু, ফারসী, সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শি ছিলেন। তাঁর রচনাবলীতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে শিক্ষা বিভাগে স্কুল ইন্সপেক্টর পদে যোগদান করে। এখান থেকে তিনি ইসলামিক ইন্টার মেডিয়েট কলেজ (বর্তমান হাজী মহসিন কলেজ) শিক্ষাকতা পেশায় যোগদান করে। এখান থেকে তাঁর শিক্ষাকতা পেশা শুরু হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সরকারী চাকুরী ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি সাতকানিয়া কলেজ, রাউজান কলেজ, রাউজান হাইস্কুল, পটিয়া কলেজ সহ অসংখ্য স্কুল কলেজে প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল শিক্ষকতা পেশায় নিজকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁর ছিল অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি যখন ক্লাস রুমে বক্তৃতা দিতেন তখন মনে হতো জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্রে দাড়িয়ে আছেন।

ক্লাস রুম ছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিক্ষায়তনে, সাধারণ সভায়, ওয়াজ মাহফিলে, ধর্মীয় সভা সমাবেশ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা রাখতেন। অধ্যক্ষ ইব্রাহীম একজন নিষ্ঠাবান ধার্মিক ও আধ্যাত্বিক ব্যক্তি ছিলেন। কুরআন, হাদিস, এলমে তাছাউফ এ ছিল তাঁর অসাধারণ পান্ডিত্য। এলমে মারফতে তিনি ছিলেন সাগর। রাসুল (সঃ) এর “দোলনা থেকে করব পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো” এর উপর তিনি বেশী আমল করতেন। তিনি শীতলপুর হযরত মৌলানা আবদুল হাদী (রাঃ) এর মুরীদ ছিলেন। তাঁর পীরের নির্দেশে রিয়াযতের মাধ্যমে রুহানী উন্নতি লাভ করলে পীর সাহেব তাকে খেলাফত প্রদান করেন। তিনি কাদেরীয়া তরিকত অনুসরণ করতেন। তিনি হুজুরে গাউছে পাক এর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। হুজুর গাউছে পাকের শানে তিনি অনেক কছিদাও লিখেছেন। তিনি ধার্মিক ছিলেন কিন্তু গোঁড়া ছিলেন না। “তিনি বলতেন বেশী দৌড়াইও না, দম বন্ধ হয়ে যাবে। ফরজ কাজ ত্যাগ করে নফল নিয়ে ব্যস্ত হইও না।” ধর্মতত্তে অধ্যক্ষ ইব্রাহীম এর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

সর্বশ্রেণীর পাঠকের জন্য তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন আশেকে রসুল (সঃ)। তাঁর রচিত গ্রন্থ সম্পূর্ণ কাব্যের উপর “নুরে মোহাম্মদী (দঃ)”-এর ইহার উজ্জ্বল প্রমাণ। অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। মহাকবি আল্লামা ইকবালের বিভিন্ন গ্রন্থাবলির বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচনা করে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। মারফতে খোদা, আছরাতে খুদি, চযরষড়ংড়ঢ়যর ড়ভ ওয়নধষ তাঁর শ্রেষ্ঠ অনুবাদ ও ব্যাখ্যা গ্রন্থ। কুরআনে করিমের তফসীর (১৭ পারা) গ্রন্থ ও তাঁর রচনাবলীর অন্তর্ভূক্ত। স্কুল, কলেজের পাঠ্য পুস্তক রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর কৃতিত্ব ছিল। তাঁর রচিত আরবি ব্যাকরণ ও ইংরেজী ব্যকরণ বই এক সময় স্কুল মাদ্রাসায় পাঠ্যছিল। ইহা ছাড়া তিনি বিভিন্ন সাময়িকি, পত্র পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি করতেন। শরিয়ত ও তরিকত, হাকিকত ও মারফত, তৌহিদ, দুঃখবাদ এরূপ অসংখ্য প্রবন্ধ তিনি বিভিন্ন সাময়িকিতে লিখে অসাধারণ কর্ম প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন যাহা এ সমাজে খুব বিরল।

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইব্রাহীম সাদাসিদে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। অর্থবিত্তের মোহ তাঁকে কখনো গ্রাস করেনি। ব্যাক্তিজীবনে তিনি সদালাপী ও মিষ্ঠবাসী ছিলেন। ৬ পুত্র ও ৬ কন্যা সন্তান ও অসংখ্যা গুনগ্রাহী আত্বীয় স্বজন ভক্ত অনুরক্তকে রেখে ১৯৭৫ সালের ১৪ই জনু ৭৫ বছর বয়সে এই কীর্তিমান পরোপকারী প্রচার বিমুখ মানুষটি ইন্তেকাল করেন। তাঁর পিতা হযরত মৌলানা আশরাফ আলী আল কাদেরী (রাঃ) মাজারের পশ্চিম পার্শ্বে তাঁকে সমাহিত করা হয়। সর্বজন শ্রদ্ধেয় বহু ভাষাবিদ নিরলস শিক্ষাবিদ জ্ঞান তাপস অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইব্রাহীম, যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন জ্ঞান সাধনায়। শত শত ছাত্র ছাত্রীকে সুশিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে গেছেন। জীবনকালে পেয়েছেন সর্বস্তরের মানুষের অকুন্ট শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। এরূপ প্রচার বিমুখ নিরভিসারী জ্ঞান তাপস এর তুলানা সত্যি বিরল। তিনি আমাদের অহংকার। তাকে জানতে পারলে আমরা সমৃদ্ধ এবং সম্মানিত হব। তাঁর আদর্শ জীবন ও মহৎ গুণগুলো যতই আলোচনায় উঠে আসবে ততই আগামী প্রজন্মের চলার পথ সহজ হবে এবং তারা সঠিক দিক নির্দেশনা খুঁজে পাবে। শাহ্ আশরাফ ফাউন্ডেশন তাঁহার স্মৃতি ধরে রাখার মানসে ইব্রাহীম স্মৃতি পাঠাগার ও ইব্রাহীম হল প্রতিষ্ঠা করেছে। গত ১৪ জুন ২০১৯ ছিল তাঁর ৪৪তম মৃত্যু বার্ষিকী। এ উপলক্ষে শাহ আশরাফ ফাউন্ডেশন ফাতেহা ও কোরআনহানি সহ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে।

লেখক ঃ নিউইয়ক সিটি ইউনির্ভাসিটিতে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকে অধ্যায়নরত এবং অধ্যক্ষ ইব্রাহীম সাহেবের নাতনী।

এখানে মন্তব্য করুন